সাম্রাজ্যবাদ ও নিপীড়িত জাতির নারীদেহ

গর্গ চট্টোপাধ্যায়
(ভাষাঃ বাংলা)
১৩ এপ্রিল ২০১৯


সাম্রাজ্যবাদ ও নিপীড়িত জাতির নারীদেহ

সাম্রাজ্যবাদ (সে ইংরেজ হোক বা হিন্দি) মূলত আগ্রাসী জাতির পুরূষের স্বার্থে আগ্রাসী জাতির পুরুষের দ্বারা নির্মিত সাম্রাজ্যবাদ। কারণ সাম্রাজ্যবাদ মানে দখল, আধিপত্য ও ভোগ। সাম্রাজ্যবাদের চোখে সেই ভোগ্যবস্তু জমি, টেন্ডার, কয়লা, রাজস্ব, চাকরি, সবকিছ, এমনকি নারীও। সাম্রাজ্যবাদী জাতির পুরুষের দৃষ্টিকোণে নিপীড়িত জাতির সকল নারী ভোগ্য বস্তু। সাম্রাজ্যবাদী জাতির দখলদার পুরুষ নির্মাণ করে যে বয়ান, নিপীড়িত জাতির পুরুষ হল "স্ত্রৈণ", দুর্বল, যৌন অক্ষম, পেলব, নিপীড়িত জাতির নারী হল বিশেষ ভাবে আকর্ষক, যৌনক্ষুধা অতৃপ্ত ( কারণ স্বজাতীয় পুরুষ যৌন অক্ষম), যে কারুর সাথে সহজেই যৌন সম্পর্ক স্থাপনে উৎসুক, আগ্রাসী জাতির পুরুষ হল "মরদ", সবল. যৌন আনন্দ দিতে সুপারস্টার, সুঠাম,আগ্রাসী জাতির নারী হল "পবিত্র", ঘরের "সম্পত্তি", স্ত্রী। এই ছক সাম্রাজ্যবাদের অংশ - যে কোন সাম্রাজ্যবাদের। এমনকি সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের যুক্তি হিসেবেও খাড়া করা হয় এই তত্ত্বের একটু ভিন্ন রূপ, যেমন হয়েছে আফগানিস্তানে শ্বেতাঙ্গ মার্কিন সেনার আক্রমনের প্রাক্কালে - যাকে বাঙালি চিন্তক গায়ত্রী চক্রবর্তী বলেছেন - "খয়েড়ি পুরুষের থেকে খয়েড়ি নারীদের শ্বেতাঙ্গ পুরুষ দ্বারা "বাঁচানো" (white men saving brown women from brown men)। এই চিন্তার প্রধান ভিত্তি হল আগ্রাসী জাতির পুরুষ মন। যার কয়েকটা উদাহরণ আমি নিচে ছবি হিসেবে দিলাম। বা দেখা যাবে এই ভিডিওতে (https://www.facebook.com/34190/videos/10103910040299691/), দিল্লীতে মিডিয়ার এক হিন্দিভাষী যুবক জিজ্ঞেস করছে "বাঙালী" বলতে দিল্লীবাসী কি বোঝে। একদল হায়েনার মত হিন্দিভাষী যুবা উত্তর দিল - "হট গার্লস, লড়কিয়া"। অর্থাৎ "দেখেই যৌন উদ্দীপনা আসে এমন মেয়ে", "মেয়েরা"। এই উত্তরের পরে তারা দিল ৩জন বাঙালী বংশোদ্ভূত নারীর ছবি। বা ইংরেজি-হিন্দি জানা শ্রেণীতে জনপ্রিয় আইডিভা নামক চ্যানেল যেখানে "গরম লাগছে" বলে হিন্দি মিশ্রিত ইংরেজিতে এক পুরুষকে দুটি হিন্দুস্তানি এলাকার নিরামিষ পদের থালা সাজিয়ে বলা হয় কোনটা খাবে। এ বিষয়ে বিশদে আলোচনা পাবেন এখানে (https://www.facebook.com/34190/videos/10105327803660551/)। এই মানসিকতায় বাঙালি নারী তার বাঙালিত্বের ফলে রূপান্তরিত হয় এক পণ্য হিসেবে আগ্রাসী জাতির পুরুষ মনে - যে বলিউডে "একজটিক" বিউটি রূপে বর্ণিত, ভোজপুরি সিনেমায় "মোনালিসা", তামিল সিনেমায় বা বাংলা সিনেমায় হরিয়ানভি বা ভোজপুরি একজটিক নির্মাণ নেই কারণ সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসন যে কল্পনা ও ফ্যান্টাসি তৈরী করে, তা নিপীড়িত জাতিতে অনুপস্থিত অর্থাৎ ব্যাপারটা "সকল" পুরুষের ব্যাপার নয়। নারীকে পণ্যরূপে মনে করার নিকৃষ্ট ধারনা সকল জাতিতেই উপস্থিত, কিন্তু এখানে সাম্রাজ্যবাদের প্রেক্ষিতে আগ্রাসী জাতির সাথে নিপীড়িত জাতির ক্ষমতার বৈষম্যের ফলে উদ্ভূত এক বিশেষ ধরনের পণ্য নির্মাণের কথা বলা হচ্ছে। এই নিকৃষ্ট কল্পনা বলিউডে শেষ হয়না। থাকে ইন্ডিয়ান আইডল জুড়ে। এখানে পাবে বিশদ আলোচনা (https://www.facebook.com/34190/videos/10105205395103281/)। এই নিকৃষ্ট সাম্রাজ্যবাদী দৃষ্টিকোণের কারণে দেহব্যবসায় ভারত জুড়ে নানা অহিন্দি জাতির নারীদের জন্য বিকৃত বিশেষ "চাহিদা", পর্নগ্রাফির "ভারতীয়" বাজারে তাই বিশেষ করে থাকে "বেঙ্গলি ওম্যান" এর স্থান। এই বলিউড থেকে পর্নোগ্রাফি, এই বিরাট ব্যপ্তির যোগসূত্র এক - সাম্রাজ্যবাদের প্রেক্ষিতে নিপীড়িত জাতির নারীকে দখলি সম্পত্তি মনে করা আগ্রাসী জাতির পুরুষ। যে কোন সাম্রাজ্যবাদের সুবিধাপ্রাপ্ত পুরুষের যৌন লক্ষ্য আছে। সেটা হল প্রতিটি নিপীড়িত জাতিভূমিকে নিজেদের হারেম বা হারেম সাপ্লাই এলাকায় পরিণত করা। যেহেতু আগ্রাসনের ব্যপ্তি বিশাল - ধর্ষণ থেকে হারেম নির্মাণের অবকাঠামো তৈরী করা। এই অবকাঠামোর দুটি লক্ষ্য - নিপীড়িত জাতিকে তার বাস্তব, তার ইতিহাস, তার যাপন, তার ভূগোল, তার নান্দনিকতা, তার সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন করে ইংরেজি-হিন্দি কেন্দ্রিক এক দুনিয়ায় প্রবেশ ঘটানো যেখানে ঠারেঠোরে এই ধারনায় নিপীড়িত জাতিকে চুবনো যায় যে সবের সেরা আগ্রাসী জাতির পুরুষ। এই নির্মাণের দ্বিমুখী লক্ষ্য। এক, নিপীড়িত জাতির পুরুষকে হীনমন্যতায় ভরানো। দুই, নিপীড়িত জাতির নারীর কাছে আগ্রাসী জাতির পুরুষকে ইপ্সিত হিসেবে স্হাপনা করা। এক্ষেত্রে বলিউড হল একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। আইপিএল ক্রিকেট হয়ে উঠেছে তাই। দিল্লীর বোর্ড, যেখানে বাংলা মাতৃভাষাকে প্রথম ভাষা হিসেবে নেওয়া নিষিদ্ধ এবং হিন্দি প্রায় বাধ্যতামূলক ইংরেজির সাথে, তাও এই বিকৃত সাম্রাজ্যবাদী নির্মাণ প্রকল্পের গণ বিস্তারের এক সহায়ক শক্তি। সেটা এই বাংলার ক্ষেত্রে দিল্লী বোর্ডের ভূমিকা শুধু ভাষাগত প্রশ্ন না। দিল্লী বোর্ডের ভূগোলে যে বাংলার ভূগোল নেই, বাংলার ইতিহাস নেই, বাংলার সংস্কৃতি ও বাস্তব নেই, আছে যে বিচ্ছিন্নতার ও শিকড়হীনতার চাষ। আর আছে মূলত গঙ্গা যমুনা হিন্দি বলয়ের ইতিহাস, নায়ক, উপমা। সাথে আছে শ্রেণী প্রশ্ন যা সাম্রাজ্যবাদের প্রেক্ষিতে জাতি প্রশ্নের সমার্থক। যেহেতু দিল্লী বোর্ডের ইস্কুল মানে অনেক পয়সা দিয়ে পড়াদের ইস্কুল, এই বাংলার বাস্তবতায় সেই ইস্কুলসমূহে বাঙালীর প্রতিনিধিত্ব অর্থাৎ ক্লাসের জনবিন্যাস বাংলার ৮৭% বাঙালীর বাস্তবতার চেয়ে ভিন্ন। অর্থাৎ বাঙালী কম। সেই বোর্ডে বাঙালীর ভাষা নেই বা কম, শতাংশ কম, ইতিহাস কম, ভূগোল কম, সংস্কৃতি কম, এমনকি খাবার কম (বাংলায় আমিষ টিফিন নিষিদ্ধ কোন স্কুল বাংলা বোর্ডের না, সব দিল্লী বোর্ডের)। পাশাপাশি রাখুন বাংলা বোর্ড ও দিল্লী বোর্ডের দুটি ১৮ বছর বয়সী ছেলে। বাংলার এই দুই বাঙালী ছেলের কল্পনায় কার ক্ষেত্রে নায়ক দেব বা দেব অধিকারী অনুকরণীয় নায়ক হবার বেশি সম্ভাবনা আর কার ক্ষেত্রে কোন বলিউড হিন্দি নায়ক অনুকরণীয় নায়ক হবার সম্ভাবনা বেশি? এটার যা উত্তর, সেটা সেই ১৮ বছরের ছেলে দুটির দুইজন বাঙালী সহপাঠী মেয়ের ক্ষেত্রেও এক হবার সম্ভাবনাই খুব বেশি নয় কি? এটা কোন বোর্ডে পড়া কারুর কারুর দোষগুণ না। দোষগুণ তো নিজ চরিত্র বা স্বাধীন বৈশিষ্ট্য। সাম্রাজ্যবাদের প্রেক্ষিতে মুক্তি বা স্বাধীন ইপ্সা বলে কিছু রাখা একটি নিরন্তর সংগ্রাম। কৃষ্ণাঙ্গ জাতীয়তাবাদী আসাটা সাকুর বলেছিলেন যে মুক্তির লড়াইয়ের প্রথম শর্ত হল এই চেতনা থাকা যে আমরা দাস, আমরা শৃঙ্খলিত। সাম্রাজ্যবাদ সদাই চেষ্টা করে দাসত্বের শিকলকে প্রভুর বদান্যতায় পাওয়া গৃহভৃত্যের অলঙ্কার হিসেবে দেখাতে, বোঝাতে। সাম্রাজ্যবাদী শাসনের ফলে ১৯৪৭ থেকে এবং বিশেষত ২০১৪র পর থেকে বাংলা সমেত সকল অহিন্দি জাতির থেকে রাজস্ব ও সম্পদ লুঠ করে দিল্লী গুরগাঁও নয়ডা কেন্দ্রিক যে হিন্দিবলয়ের শিক্ষা ও চাকরির সুযোগ তৈরি করা হয়েছে, তাতে যেতে বাধ্য হয় বাংলার ছেলেমেয়েরা, কারণ আমাদের গ্রাসের ভাত কেড়ে ওখানকার রাজমা চাউলের দোকান তৈরী। দিল্লীর এই কৃত্রিম উপায়ে লুঠের মালে তৈরি হিন্দি ইংরেজি সুযোগ সুবিধার বিশ্বে দরকার পরে কর্মক্ষম যুবারা। বাংলা থেকে কে সেই হিন্দি মালিকানাধীন ইংরেজি হিন্দি পরিসরে "কুল" শ্রমশক্তি হবার লড়াইয়ে "এগিয়ে"? বাংলার বাংলা বোর্ড না বাংলায় জুড়ে বসতে চাওয়া দিল্লী বোর্ড? সেই পরিসর তো আগ্রাসী জাতির পুরুষের নিজভূমি। ঐ "হট গার্লস" বলা হায়নার মৃগয়াভূমি। ঐ আইডিভা "গরম লাগছে" চ্যানেলের সদর দফতর। এটাই সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসী জাতির পুরুষতন্ত্রের ছক। তুমিও বোঝ, আমিও বুঝি, আমি বলেছি মাত্র।

সাম্রাজ্যবাদের প্রেক্ষিতে নিপীড়িত জাতির সব ইপ্সাই শৃঙ্খলিত এবং আগ্রাসী জাতির পুরুষের স্বার্থে নির্মিত ও নির্ধারিত। আমি শৃঙ্খলমোচনে বিশ্বাসী। প্রেম, ভালোবাসা, লালসা, যৌনতা হোক উন্মুক্ত। আসুন সেই বাংলা গড়ি।

জয় বাংলা

ছবি