একুশে ফেব্রুয়ারি, বাঙালির যুক্তরাষ্ট্রীয় অধিকার, অন্যান্য জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার আদায়ের লড়াই

প্রশাসক
(ভাষাঃ বাংলা)
০৮ মার্চ ২০১৯


**একুশে ফেব্রুয়ারি, বাঙালির যুক্তরাষ্ট্রীয় অধিকার, অন্যান্য জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার আদায়ের লড়াই**

একুশ মানে চেতনা।
একুশ মানে সোজা শিরদাঁড়া।
একুশ মানে স্বপ্ন।
একুশ মানে প্রত্যয়।
একুশ মানে জয়ের শপথ।

১৯৫২ সালের এই দিনে মায়ের ভাষাকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে উর্দু সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল বাঙালি। ১৪৪ ধারাকে উপেক্ষা করে মুখে শ্লোগান, বুকে বল নিয়ে ঢাকার রাজপথ কাঁপিয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা। বাংলা মায়ের দামাল সন্তান রফিক সালাম, শফিউর রহমান, বরকত, আব্দুল জব্বার এবং আরো অনেক বীর যোদ্ধার রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল রাজপথ। তীব্র গণআন্দোলনে কাঁপন ধরেছিল উর্দূ সাম্রাজ্যবাদী পাকিস্তানি শাসকের বুকে। তৈরি হয়েছিল ইতিহাস। এরপর ২০০০ সাল থেকে প্রতিবছর এই দিনটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে বিশ্বজুড়ে পালিত হয়।

এই ইতিহাস আমাদের কি শেখায়? আমাদের জাতিচেতনা শেখায়, ভাষা তথা জাতির অধিকার নিয়ে সচেতন হতে শেখায়, জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের  অধিকার নিয়ে সচেতন করে। কিন্তু আমরা কি শিক্ষা নিই? বছরে একদিন ফেসবুকের কভার ছবি 'ভাষা শহীদ মিনার' করলে, শুধু ফুল- ধূপকাঠি দিয়ে আর "আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো..." গেয়েই কি আমাদের কর্তব্য শেষ? আমাদের সচেতন হতে হবে, সচেতন করতে হবে, সোশ্যাল মিডিয়া,চায়ের দোকান, লোকাল ট্রেন,  সর্বত্র এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা বাড়াতে হবে, জাতির যুক্তরাষ্ট্রীয় অধিকারের এই দাবিগুলো নিয়ে বারবার সোচ্চার হতে হবে। আমাদের বুঝতে হবে ভাষার সাথে জাতির অধিকারের সম্পর্ক মা-সন্তানের। ভাষা জাতির জন্ম দেয়। ভাষা বাঁচলে জাতি বাঁচবে। ভাষার অধিকার সুরক্ষিত হলে জাতির অর্থনৈতিক-সামাজিক-রাজনৈতিক অধিকার সুরক্ষিত হবে। ভাষার সাথে কোন জাতির মানুষের পেটের সরাসরি সম্পর্ক।

এবার ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেক্ষিতে আসা যাক। ভারত একটি বহুজাতিক যুক্তরাষ্ট্র। ভারতীয় সংবিধান অনুযায়ী সব ভাষার সমান অধিকার রয়েছে। কিন্তু তা কি বাস্তবেই রয়েছে? বাংলা কি হিন্দির সমান মর্যাদা পায়? উত্তরঃ না! বহুবিধ ক্ষেত্রে বাংলা ও বাঙালির অধিকার খর্ব করা হয়েছে স্বাধীনতার পর থেকে। হিন্দি সাম্রাজ্যবাদ ভাষাভিত্তিক বৈষম্যকে করেছে প্রকট থেকে প্রকটতর। বাঙালি সহ সকল অহিন্দি জাতিকে ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত করা হয়েছে ।  'হিন্দি ভারতের রাষ্ট্রভাষা' এই মিথ্যাকে বারবার সামনে এনে খর্ব করা হয়েছে বাংলা তথা সমস্ত অহিন্দি ভাষার অধিকার। এর কিছু নমুনা দিলে এই ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে। ৯০% সর্বভারতীয় পরীক্ষা বাংলায় হয় না,  স্বাধীনতার ৭২ বছর পরেও ভারতীয় সংবিধানের সরকার-স্বীকৃত কোনো বাংলা অনুবাদ নেই, অধিকাংশ ব্যাঙ্ক ও বীমার ফর্মে বাংলা থাকে না যার ফলে গ্রাম বাংলার বিরাট সংখ্যক মানুষের মাতৃভাষা জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও নিজেকে নিরক্ষর বলে মনে করেন, অধিকাংশ রেলের কামরা সহ নানা সরকারি জায়গায় নিরাপত্তা সংক্রান্ত নির্দেশাবলী বাংলায় থাকে না কারণ হিন্দি সাম্রাজ্যবাদের কাছে বাঙালির প্রাণের দাম নেই, নানা সরকারি পরিষেবা বাংলায় পাওয়া যায় না, রেলের টিকিটে বাংলা থাকে না, সেনার চাকরির পরীক্ষায় বাংলা থাকে না, ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের পাসপোর্টে বাংলা থাকে না, জয়েন্ট এন্ট্রান্স মেন পরীক্ষায় হিন্দি, ইংরেজির সাথে গুজরাটি থাকলেও বাংলা থাকে না  ---এমনই অজস্র মৌলিক অধিকারের বিষয় রয়েছে যা নিয়ে আমাদের সচেতন হতেই হবে।

একই সাথে বাংলার ক্ষেত্রেও নানা ত্রুটির কারণে হিন্দি সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসী  থাবাকে আরও শক্তিশালী করছে। ঠিক তাই জন্যই  সাঁওতালি, রাজবংশী, নেপালি ভাষাভাষী অধ্যুষিত অঞ্চল বাদে সমগ্র বাংলার প্রতিটি বিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে যা ইতিমধ্যেই বহু রাজ্য কার্যকর করেছে। বাংলার সরকারের সকল স্তরের সকল চাকরিতে লিখিত ও মৌখিক বাংলা, সাঁওতালি, নেপালি বা রাজবংশী পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। শুধু তাই নয় বাংলার প্রতিটি প্রশাসনিক কাজকর্মে বাংলা বাধ্যতামূলক করতে হবে অর্থাৎ বাংলাকে কাজের ভাষা বানাতে হবে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না বাংলা রাজ্য বাংলা ভাষার ভিত্তিতে তৈরি হয়েছিল। এগুলি সুনিশ্চিত হলে ২১শে ফেব্রুয়ারির জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে না, বছরের প্রতিটা দিনই হবে মাতৃভাষা দিবস উদযাপনের দিন।

গোটা বিশ্বে নানা জাতিসত্তার মানুষ তাদের মাতৃভাষা ও জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার অর্জনের সংগ্রাম  চালাচ্ছে দীর্ঘ সময় ধরে। জাতিসত্তার আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রে তামিলরা সবচেয়ে সফল যার নেপথ্যে রয়েছে পেরিয়ার,আন্নাদুরাই, করুণানিধির মত তামিল জাতীয় নায়কদের নেতৃত্বে চলা প্রায় ১০০ বছরের গৌরবময় তামিল জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ইতিহাস। এছাড়াও কন্নড়, মারাঠি, নাগা, পাঞ্জাবি ইত্যাদি জাতিসত্তার ভাষা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার আদায়ের লড়াই চলছে। প্রতিবেশী রাষ্ট্র পাকিস্তানেও সিন্ধি, বালোচের মত জাতিসত্তাগুলোর ভাষা সংগ্রাম ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার অর্জনের লড়াইয়ের ধারাও বয়ে চলেছে নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে।

একই সাথে আমরা যেন ১৯ শে মে-র বরাকের ভাষা আন্দোলন এবং মানভূম ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ভুলে না যাই। বাঙালির এই তিনটি ভাষা আন্দোলনের বিস্তারিত ইতিহাস রাজ্য বোর্ডের ছেলেমেয়েদের পড়াতে হবে। হিন্দি সাম্রাজ্যবাদ আমাদের ইতিহাস ভুলিয়ে দিতে চায়, অস্বাভাবিক কে স্বাভাবিক মনে করায়। আমরা আমাদের ইতিহাস ভুলতে দেবো না, অস্বাভাবিককে স্বাভাবিক মনে হতে দেব না। আমাদের ইতিহাসকে আগামী প্রজন্মের সামনে বারবার তুলে ধরব। হিন্দি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই আসলে বিস্মৃতির বিরুদ্ধে স্মৃতির লড়াই। হিন্দি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ভাষাই হবে আমাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। ভাষা তথা জাতির যুক্তরাষ্ট্রীয় অধিকারের জয়ধ্বজা আমরা ঊর্ধ্বে তুলে ধরব। সেই পতাকার নিচে দাঁড়িয়ে মাকে রক্ষার, মাটিকে রক্ষার শপথ নেব আর 'নাগরিক কবিয়াল' এর অমোঘ পরামর্শ অক্ষরে অক্ষরে পালন করবঃ "প্রতিরোধ করো, এটাই এখন কাজ।"

জয় বাংলা।

(লেখাঃ অনুষ্কর)

ছবি