বিজেপির বাংলা ও বাঙালি বিরোধী চরিত্র ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে

প্রশাসক
(ভাষাঃ বাংলা)
১৪ নভেম্বর ২০১৮


আরএসএস-বিজেপি হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান অর্থাৎ এক ভাষা-এক ধর্ম-এক দেশের মতাদর্শে বিশ্বাসী। এই মতাদর্শ ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তাই জন্মলগ্ন থেকেই আরএসএস ও বিজেপি ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি অহিন্দি জাতি,যার মধ্যে বাঙালিও পড়ে ,তার ঘোর বিরোধী। ব্যাপারটা আরো একটু খোলসা করা যাক।

বিজেপির মতাদর্শের সাথে বাংলার সংস্কৃতির যে চিরকালীন বিরোধ সেই ইতিহাস একটু দেখে নিই। বিজেপির পূর্বসূরী হিন্দু মহাসভা ছিল একই মতাদর্শের যার নেতা ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী। এই শ্যামাপ্রসাদের হিন্দু মহাসভা সম্পর্কে বাঙালির জাতীয় নায়ক সুভাষচন্দ্র বসু এক বক্তৃতায় বলছেন-“সন্ন্যাসী সন্ন্যাসিনী দের ত্রিশূল হাতে হিন্দু মহাসভা ভোট ভিক্ষায় পাঠিয়েছে। ত্রিশূল আর গেরুয়া বসন দেখলেই হিন্দু মাত্রই শির নত। ধর্মের নামে ধর্মকে কলুষিত করে হিন্দু মহাসভা রাজনীতির ক্ষেত্রে দেখা দিয়েছে। হিন্দু মাত্রই এর নিন্দা করা কর্তব্য। এই বিশ্বাসঘাতকদের আপনার রাষ্ট্রীয় জীবন থেকে সরিয়ে দিন। এদের কথা শুনবেন না।” (১৪ ই মে ১৯৪০ আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত)। দূরদর্শী সুভাষ প্রথমাবস্থাতেই এদের সাম্প্রদায়িক, বাংলা-বিরোধী রূপ চিনে গিয়েছিলেন। সুভাষ এও বলেছিলেন যে দরকারে বলপ্রয়োগ করে হলেও তিনি হিন্দু মহাসভা কে আটকাবেন, আর তাই তার অনুগামীরা সদলবলে গিয়ে হিন্দু মহাসভার নানা মিটিং ভাঙচুর করে বন্ধ করে দিত।স্বাধীনতার আগে ও পরে বাংলার নির্বাচনে ১০ শতাংশেরও কম ভোট পাওয়া হিন্দু মহাসভার তৎকালীন প্রধান নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীকেই ‘পশ্চিমবঙ্গের জনক’ বলে নির্লজ্জ হাস্যকর মিথ্যা প্রচার করছে বিজেপির বঙ্গজ দালালরা।

মতাদর্শগতভাবে বিজেপি একটি হিন্দি সাম্রাজ্যবাদী দল। অর্থাৎ বিজেপি যে কোনো উপায়ে বাঙালি সহ অহিন্দি জাতিগুলির ওপর হিন্দি ভাষাকে চাপিয়ে দিতে চায় সবসময়। বাংলাকে গোবলয়ের উপনিবেশ বানাতে পারলে এবং বাঙালিকে হিন্দি সাম্রাজ্যবাদের দাস বানাতে পারলে বিজেপির প্রভূত রাজনৈতিক লাভ। ঠিক এই রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থেকেই বিজেপি প্রতিক্ষেত্রে বাঙালির ওপর হিন্দি ভাষাকে চাপিয়ে দিয়ে,বাঙালিকে হীনমন্য করে গোবলয় থেকে আগত হিন্দিভাষী দের বাংলার চাকরি- বাজার-পুঁজি দখলের উপযুক্ত ক্ষেত্র প্রস্তুত করছে প্রতি মুহূর্তে। কারণ ভাষার সঙ্গে অর্থনীতির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে বহুবিধ সম্পর্ক আছে।বিজেপির বাংলা বিরোধী মনোভাব আরও স্পষ্ট হয় যখন আমরা দেখি কেন্দ্র গুজরাট এমনকি নেপালকে বন্যা ত্রাণের টাকা দিলেও বাংলা কে দেয় না। ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিজেপি বাংলায় চলা অসংখ্য কেন্দ্রীয় প্রকল্পের বাজেট বরাদ্দ ভয়ানক ভাবে কমিয়ে দিয়েছে। সম্প্রতি কেন্দ্র অর্থ কমিশনের টাকা বরাদ্দের ক্ষেত্রে ভিত্তি বছর হিসেবে ১৯৭০ এর পরিবর্তে ২০১১ কে আনতে চাইছে, যার ফলে এই মাঝের বছরগুলিতে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পাবার পরেও কমবেশি প্রায় ২০০০০ কোটি টাকার মত বিরাট অঙ্কের অর্থ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হবে বাংলা,লাভবান হবে সেই গোবলয়ের রাজ্যগুলি যেখানে মধ্যবর্তী এই বছরগুলোতে অনিয়ন্ত্রিতভাবে জন্মহার প্রভূত বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ভাবেই নানা উপায়ে বিজেপি বাংলা ও বাঙালিকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দিতে চাইছে।

এসব বঞ্চনার বিরুদ্ধে বাঙালি প্রশ্ন তোলার আগেই বাংলায় বিজেপি সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের মাধ্যমে দাঙ্গা পরিস্থিতির সৃষ্টি করে সব ভুলিয়ে দিতে সচেষ্ট হয়।

বিজেপির বাঙালি বিরোধী ষড়যন্ত্রের সাম্প্রতিকতম উদাহরণ হল আসামে এনআরসি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ৩৮ লক্ষ বাঙালিকে (এর মধ্যে ২৮ লক্ষ হিন্দু বাঙালি ও ১০ লক্ষ মুসলমান বাঙালি) বাস্তুচ্যুত করার চক্রান্ত এবং তাকে কেন্দ্র করেই পাঁচজন বাঙালির গণহত্যা। এনআরসির জন্য ২৩ জন হিন্দু সহ ৩০ জন বাঙালি আত্মহত্যা করার পরেও যখন সারাক্ষণ ‘হিন্দু-হিন্দু’ করা বঙ্গ বিজেপির কাছ থেকে কোনো বিবৃতি পাওয়া যায় না তখন স্বভাবতই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে বাঙালির ক্ষেত্রে বিজেপি কোনো ধর্ম দেখেনা। পাঁচজন বাঙালির গণহত্যার প্রায় ১৫ ঘন্টা অতিক্রান্ত হওয়ার পর বঙ্গ বিজেপির বিবৃতি আসে যাতে একবারও ‘বাঙালি’ কথার উল্লেখ নেই, ততক্ষনে বাংলার অন্যান্য দল প্রতিবাদ কর্মসূচির প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছে। এভাবেই নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে বিজেপির বাংলা ও বাঙালি বিরোধী রূপ পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে।

সম্প্রতি বিজেপির কিছু বুদ্ধিজীবী বিজেপি নেতাদের ‘বাঙালি’ হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। বিজেপি ও তার সহযোগী সংগঠন গুলির মিটিং মিছিলে অফুরান হিন্দি স্লোগান, অগণিত হিন্দিভাষী বহিরাগত নেতাকর্মীর আগমনই বুঝিয়ে দেয় যে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সাথেই এরা কতটা সম্পর্কহীন।

তাই আগামী ২০১৯ এর লোকসভা নির্বাচনে বাংলার সমস্ত অসাম্প্রদায়িক দলগুলির একজোট হয়ে বাংলা ও বাঙালি বিরোধী বিজেপি কে হারানোর জন্য সচেষ্ট হওয়া উচিত। কারণ আগামী ২০১৯ এর লড়াই বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার লড়াই,বাংলার চাকরি-বাজার-পুঁজি বহিরাগতদের দখলে চলে যাবার হাত থেকে আটকানোর লড়াই, বাংলার সম্প্রীতির ঐতিহ্য রক্ষার লড়াই, বাঙালির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। বিজেপি-আরএসএস- ভিএইচপি-বজরং দল — এরা বাংলা ও বাঙালির কাছে অভিশাপ। তাই এবারের সংগ্রাম বাংলা ও বাঙালির শাপমুক্তির সংগ্রাম।

(লেখাঃ অনুষ্কার গাঙ্গুলী, খবরের লিঙ্কঃ এখানে)

ছবি