আমাদের সম্বন্ধে

ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র (যা ভারত বা ইন্ডিয়া রাষ্ট্র নামে পরিচিত) নানা রাজ্যের সমাহার। কিন্তু এই যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে ধ্বংস করে রাজ্যের অধিকার কেড়ে নিয়ে হিন্দি সাম্রাজ্যবাদ বাংলা ও বাঙালীর বিরুদ্ধে বৈষম্য চালাচ্ছে, আমাদের শেষ করে দিচ্ছে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভাবে, ধ্বংস করছে পশ্চিমবঙ্গে বাঙালী জাতির অধিকার, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের অধিকার। এই ফন্দিকে অসফল করতে চায় বাংলা পক্ষ। ভারতীয় সংবিধানের মূলনীতি রক্ষা করতে, এই আক্রান্ত যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে রক্ষা করে আরও সুদৃঢ় করতে সমানাধিকার ও সম্মানের ভিত্তিতে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যসাধনের জন্য দরকার একটি সত্যিকারের যুক্তরাষ্ট্রীয় বা ফেডারেল ব্যবস্থা। সত্যিকারের ফেডারেল ব্যবস্থা সেটাই, যেখানে মুদ্রানীতি (অর্থাৎ রিজার্ভ বেঙ্ক), রেল, অন্য রাষ্ট্রের থেকে প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র ছাড়া অন্য সকল ক্ষেত্র সম্পূর্ণভাবে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের হাতে ন্যস্ত করতে হবে। এটাই আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য। যতদিন এই চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জিত না হয়, ততদিন আমরা নিচের দাবীগুলি পূরণের জন্য বাংলা ও বাঙালীর পক্ষে আন্দোলন করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।

বাংলাপক্ষের ৩০ দফা দাবী সনদ

(১) পশ্চিমবঙ্গে প্রতিটি (রাজ্য, কেন্দ্র ও রাজ্য/কেন্দ্র অধীন সংস্থা) সরকারি চাকরিতে যোগদান করতে হলে বাংলা লিখতে, বলতে ও পড়তে জানা আবশ্যিক হতে হবে। তা লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে নির্ধারিত হতে হবে। এই ধরনের ৮৫% পদ পশ্চিমবঙ্গের অধিবাসীর (অর্থাৎ শুধু মাত্র পশ্চিমবঙ্গে ভোটার, এমন নাগরিক) জন্য সংরক্ষিত হতে হবে। কেন্দ্রীয় সরকার বা কেন্দ্রীয় সরকারী সাহায্যপ্রাপ্ত সকল চাকরি ও টেন্ডারের ক্ষেত্রে ৮% সংরক্ষণ থাকতে হবে পশ্চিমবঙ্গের অধিবাসীদের।

(২) পশ্চিমবঙ্গে সব উচ্চ প্রশাসনিক/পুলিশ পদে ডাবলুবিসিএস/ডাবলুবিপিএস থাকতে হবে, আইএএস/আইপিএস নয়।

(৩) পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত কেন্দ্র/রাজ্য সরকারি সকল প্রশাসনিক পদের পদোন্নতি নির্ধারণ করবে পশ্চিমবঙ্গ সরকার।

(৪) সর্বভারতীয় সকল পরীক্ষার সকল স্তরে বাংলা ভাষায় পরীক্ষা দেওয়ার অধিকার থাকতে হবে।

(৫) সকল সরকারি (যেমন টেন্ডার, সরকারী বা সরকারী সাহায্যপ্রাপ্ত দফতর, ব্যাঙ্ক, বিমা, ডাকঘর, টেলিকম, রাস্তা, ইত্যাদি) ও বেসরকারি ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গে সকল তথ্য ও পরিষেবা প্রদান আবশ্যিক ভাবে বাংলায় করতে হবে।

(৬) পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে অবস্থিত স্নাতক ও স্নাতকোত্তর স্তরের প্রতিটি সরকারি ও সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য উচ্চমাধ্যমিক বোর্ডের ছাত্রছাত্রীদের জন্য ৮৫% আসন সংরক্ষণ করতে হবে।

(৭) পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত সকল স্কুলে ইতিহাস ও ভূগোল বিষয়ের পাঠ্যক্রম অন্তত ৫০% বাংলা সম্বন্ধীয় হতে হবে।

(৮) পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত সকল প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদের মালিকানা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের হাতে দিতে হবে।

(৯) একতরফা ভাবে কোন রাজ্য ভাগের অধিকার কেন্দ্রের থাকা চলবে না।

(১০) ভারত যুক্তরাষ্ট্রের পাসপোর্টে তথা ভারত সরকারের সকল ফর্ম ও ওয়েবসাইটে বাংলায় সকল তথ্য থাকা ও তথ্য জমা দেওয়ার অধিকার বাধ্যতামূলক ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।

(১১) রাজ্য ও যৌথ তালিকাভুক্ত যে কোন বিষয়ে বিশ্বের যে কোন প্রতিষ্ঠানের সাথে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বা রাজ্যের সংস্থার স্বাধীনভাবে ঋণ গ্রহণ সহ যে কোন চুক্তি সম্পাদনের অধিকার থাকতে হবে।

(১২) পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে লব্ধ বা উৎপাদিত সব পণ্যের উপর পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সেস বসানোর অধিকার থাকতে হবে।

(১৩) পশ্চিমবঙ্গে শিল্প-বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান স্থাপনের জন্য সকল ছাড়পত্র দেবার এক্তিয়ার পশ্চিমবঙ্গ সরকারের হাতে থাকতে হবে। সকল সরকারী ও সরকারী সাহায্যপ্রাপ্ত সংস্থার পশ্চিমবঙ্গের ৮৫% বরাত ও ৮৫% বরাদ্দ পশ্চিমবঙ্গে পঞ্জিকৃত সংস্থা বা শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গের ভোটার কোন ব্যক্তিকে দিতে হবে।

(১৪) পশ্চিমবঙ্গ সরকার ও তার অধীন সকল সংস্থার সকল প্রশাসনিক কাজ বাংলা ভাষায় হতে হবে। ভারত রাষ্ট্র হিন্দিকে সাংবিধানিক ভাবে যে মান্যতা ও অধিকার দেয়, বাংলা ভাষাকে সেই একই অধিকার দিতে হবে। পশ্চিমবঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকার ও তার অধীন সকল সংস্থার সকল প্রশাসনিক কাজ বাংলায় হতে হবে। ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের সরকারী কর্মে, যেমন জনগণমন গাওয়া বা বাংলায় সরকার বা সরকারী সাহায্যপ্রাপ্ত কোন সংস্থা কর্তৃক ছাপা কিছুতে বাংলা ভাষাকে বিকৃত করলে কর্মে গাফিলতির জন্য শাস্তির বিধান থাকতে হবে।

(১৫) কলকাতায় সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চ স্থাপন করতে হবে। কলকাতা হাইকোর্টে বাংলা ভাষাকে সেই অধিকার দিতে হবে যা এলাহাবাদ হাই কোর্টে হিন্দির আছে।

(১৬) পশ্চিমবঙ্গে উৎপাদিত ফসল ফুড কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া কত দামে কিনবে, তা পশ্চিমবঙ্গের বাস্তবতা অনুযায়ী নির্ধারণ করবে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার। একইভাবে, পশ্চিমবঙ্গে রেশন ব্যবস্থায় দেয় সামগ্রী কোন মূল্যে দেওয়া হবে, তা নির্ধারণ করবে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার।

(১৭) পশ্চিমবঙ্গে ১০০ দিনের কাজের দৈনিক মজুরী ঠিক করবে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার।

(১৮) পশ্চিমবঙ্গে দেওয়া সকল বিজ্ঞাপনের বাংলা সংস্করণ সবচেয়ে বহুল প্রচারিত সংস্করণ হতে হবে। এই বিজ্ঞাপন বাংলার সংস্থার দ্বারা উৎপাদিত হতে হবে।

(১৯) পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষাগৃহে দেখানো সকল সিনেমায় বাংলা সাবটাইটেল থাকতে হবে। তা না হলে তা পশ্চিমবঙ্গে প্রচারিত হবার ছাড়পত্র দেওয়া যাবে না। পশ্চিমবঙ্গে যে সিনেমা প্রচারিত হবে, তার ছাড়পত্র দেবার অধিকার থাকবে একমাত্র রাজ্যের নিজস্ব সিনেমা সারটিফিকেশন বোর্ডের।

(২০) বাংলা সিনেমার উপর জিএসটি বাতিল করতে হবে।

(২১) পশ্চিমবঙ্গের বাইরে তৈরি কোন সিনেমা যদি পশ্চিমবঙ্গে বাংলা ভাষান্তর করে প্রচারিত হয়, তার জন্য বিশেষ কর ছাড়ের ব্যবস্থা করতে হবে। পশ্চিমবঙ্গে তৈরি পশ্চিমবঙ্গের ভূমিজ ভাষার বিনোদন মূলক অনুষ্ঠান তথা প্রকাশনায় বিশেষ কর ছাড়ের ব্যবস্থা করতে হবে।

(২২) কেন্দ্রের টাকায় পশ্চিমবঙ্গে হিন্দি শেখানো ও হিন্দি শেখার জন্য পয়সা দেওয়া চলবে না। হিন্দি ভাষা শিক্ষা ছাড়া পশ্চিমবঙ্গে কোন চাকরি বা তথ্য বা পরিষেবার ক্ষেত্রেই হিন্দি বাধ্যতামূলক করা চলবে না।

(২৩) পশ্চিমবঙ্গে বিক্রি হওয়া সমস্ত প্যাকেটজাত পণ্যের সকল তথ্য বাংলা হরফে সবচেয়ে বড় আকারে থাকতে হবে।

(২৪) পশ্চিমবঙ্গে বিমান, রেল, জাহাজ, সড়ক সহ যে কোন পরিবহন ব্যবস্থায় সকল ঘোষণাগুলি বাংলাতে করতে হবে।

(২৫) ভারতীয় সেনার অধীনে বাংলা রেজিমেন্ট গঠন করতে হবে। সেই রেজিমেন্টে ৮৫% পদ সংরক্ষিত হবে পশ্চিমবঙ্গের অধিবাসীদের জন্য। এই রেজিমেন্টের ভিতরের সকল কাজ পরিচালিত হবে বাংলায়। নির্বাচিত রাজ্য সরকারের অনুমতি ছাড়া সীমান্ত ও ব্যারাক ব্যতীত রাজ্যে কোথাও কোন কেন্দ্রীয় বাহিনী থাকতে পারবে না।

(২৬) বাংলা ভাষার সকল স্থানীয় উপভাষাকে উৎসাহ ও মর্যাদা দিতে হবে।

(২৭) ১৯৪৭এর পর থেকে কেন্দ্র বাংলা থেকে যা যা কর তুলেছে, তার যে অংশ বাংলাকে ফেরত দেয়নি, তা বর্তমান মূল্য অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারকে ফেরত দিতে হবে। মাশুল সমীকরণ নীতির ফলে পশ্চিমবঙ্গের যে শিল্প ও রাজস্বের ক্ষতি হয়েছে, তা নির্ণয় করে, বর্তমান মূল্যে সেই টাকার অঙ্ক ক্ষতিপূরণ হিসেবে পশ্চিমবঙ্গকে ফেরত দিতে হবে।

(২৮) পশ্চিমবঙ্গ থেকে তোলা রাজস্বের ১০০% পশ্চিমবঙ্গ সরকার এবং পশ্চিমবঙ্গের অধিবাসীদের ফেরত দিতে হবে।

(২৯) পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত স্থানের নামের ইংরেজি বানান বাংলা উচ্চারণ অনুযায়ী রাখতে হবে।

(৩০) সংবিধানের ৩৫৬ ধারা বিলোপ করতে হবে। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার অধিকার থাকবে শুধু পশ্চিমবঙ্গ বিধান সভায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের। কোন জরুরী অবস্থার অছিলায় পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের কোন অধিকার কেন্দ্রীয় সরকার বা আর কেউ খর্ব করতে পারবে না।