নাগরিকত্ব বিলের ভাঁওতাবাজি, অসমিয়া সংরক্ষণ ও আসামে বাঙালির ভবিষ্যত

প্রশাসক
(ভাষাঃ বাংলা)
১০ জানুয়ারী ২০১৯


ওরে বাবা! বিজেপি কি ভালো! বিজেপি হিন্দু বাঙালির রক্ষাকর্তা। বিজেপি নাগরিকত্ব বিল এনেছে। আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে! হিন্দু বাঙালির আর কোনো বিপদ নেই! সবাই নাগরিকত্ব পেয়ে গেল। দাঁড়ান! একটু শান্ত হোন। জল খান। এবার আমার কটা প্রশ্নের উত্তর দিন। আরে জলটা খেয়ে নিন, বিষম খাবেন না।

নাগরিকত্ব বিলে কোথাও নাগরিকত্বের উল্লেখ আছে? জানেন, পড়েছেন বিলটা? নাগরিকত্ব বিল পাশ হল, এটা শুনে লাফাচ্ছেন? জেনে নিন না জানলে, নাগরিকত্বের কোনো উল্লেখ নেই এই বিলে। এই বিল পাশ হলেই হিন্দু বাঙালি নাগরিকত্ব পাবে না। শরণার্থী হিসাবে আশ্রয় পাবে। বাঙালি ছিল নাগরিক। ভোট দিত, চাকরি-বাকরি করত, ব্যবসা করত। সব অধিকারই ছিল। এখন বৈধ ভারতীয় থেকে হয়ে গেলেন অবৈধ বাংলাদেশি। হ্যাঁ, মশাই, এই বিলের মাধ্যমে শরণার্থী হিসাবে সুরক্ষা পেতে গেলে আগে নিজেকে অবৈধ নাগরিক (অবৈধ হিন্দু বাংলাদেশি) ঘোষণা করতে হবে।

বুঝুন এবার। ছিলেন নাগরিক, হয়ে গেলেন শরণার্থী। শরণার্থী হিসাবে ছ বছর থাকলে, যদি প্রমাণ করতে পারেন ধর্মীয় কারণে আক্রান্ত হয়ে বাংলাদেশ থেকে এসেছেন, তাহলে নাগরিকত্বের জন্য এপ্লাই করতে পারবেন। এবার প্রশ্ন - কোন ডকুমেন্ট দিয়ে প্রমাণ করবেন ধর্মীয় কারণে আক্রান্ত হয়ে এসেছেন? কি মশাই? সব গুলিয়ে যাচ্ছে?

আরও শুনুন, আসামের বাঙালির বড় সমস্যা ডি-ভোটারের নোটিশ পাওয়া। ডিটেনশন ক্যাম্পে থাকা, ফরেন ট্রাইবুনালে বিচার চলা। প্রসঙ্গত বলে রাখি, এখন প্রায় ৩ লাখ বাঙালির নামে ডি-ভোটারের নোটিশ আছে। এরা সুরক্ষা পাবে বিল থেকে? জানেন কিছু? আপনি এ বিষয়ে কিছু শুনেছেন কোথাও? বিজেপি কিছু বলেছে?

এত ভাবতে হবে না, আমিই বলে দিই। না, তাদের নিয়ে কোনো শব্দ ব্যয় করা হয়নি বিলে। ডিটেনশন ক্যাম্প নামক নারকীয় জেলে কয়েক হাজার বাঙালি আছে। নতুন ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরির জন্য কেন্দ্র সরকার ৩০০ কোটি বরাদ্দ করেছে। এই ডিটেনশন ক্যাম্প থেকে হিন্দু বাঙালির মুক্তির কোনো কথা বলা নেই। বিদেশী সন্দেহে যাদের নামে ফরেন ট্রাইবুনালে কেস চলছে, তাদেরও মুক্তির কথা বলা নেই বিলে।

এবার বুঝুন বিল কার জন্য? কি লাভ হবে হিন্দু বাঙালির? হিসাব মিলছে না বাবু? আরও শুনুন। এন আর সি ছুট হিন্দু বাঙালি বিলে সুরক্ষা পাবে? ধরে নিচ্ছি আমরা সবাই। কিন্তু "এন আর সি এক্সক্লুডেড পিপল' বলে কোনো কথা নেই বিলে। এবার সহজ প্রশ্নের উত্তর দিন, আইনে ধরে নেওয়ার কোনো জায়গা আছে? যাই হোক, ভাবুন, উত্তর না দিলেও চলবে।

এটুকু শুনে কতবার বিষম খেয়েছেন? এবার গুছিয়ে বসুন। নাহলে হয়ত বড় বিপদ হবে। এবার যেগুলো বলব, তা নিতে পারবেন তো? ১৯৮০ র দশকে বাঙালির রক্তে যখন হোলি খেলা হচ্ছে, যখন আসামের বাঙালি বিদ্বেষী জাতিবাদী সংগঠন আসু ও জঙ্গি সংগঠন উলফা বাঙালির গণহত্যা করছে, তখন বাঙালির এই রক্তখেকোদের শান্ত করতে একটা চুক্তি হয়েছিল। যার নাম আসাম চুক্তি ১৯৮৫, বাঙালির কথা না ভেবে এক তরফা একটা চুক্তি হয়েছিল বাঙালিকে আইনি ভাবে দাস বানানোর জন্য।

এই আসাম চুক্তির ৬ নং ধারা অনুযায়ী অসমিয়া জাতির সংরক্ষণের কথা বলা আছে। অর্থাৎ বাঙালি চাকরি-বাকরির অধিকার হারাবে, ভোটে লড়তে পারবে না, জমি-বাড়ি কিনতে পারবে না, ব্যবসা করতে পারবে না ইত্যাদি। সংখ্যার নিরিখে আসামে বাঙালি প্রায় ৪০%, কিন্তু বাঙালির সুযোগ অনেক কম পাবে, নগন্য। বাঙালি দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকও না, দাস হয়ে বাঁচবে। এটা অবৈধ বাঙালির জন্য না শুধু, এটা আসামের আপামর বাঙালির জন্য। অর্থাৎ যাদের নাম এন আর সি তে উঠে গেছে, তারাও দাস। মোদির নেতৃত্বাধীন ক্যাবিনেট আসাম চুক্তির ৬নং ধারা বাস্তবায়িত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। উচ্চ পর্যায়ের কমিটি তৈরি হয়েছে, যেখানে কোনো বাঙালি নেই। এই কমিটি ছ মাসের মধ্যে রিপোর্ট দেবে। ভাবতে পারছেন? হার্টের সমস্যা হচ্ছে এগুলো শুনে? আরে হ্যাঁ মশাই, হিন্দু বাঙালিকেও দাস বানাচ্ছে মোদি। অসমিয়া জাতিগোষ্ঠী গুলিকে ST ক্যাটেগোরিতে ঢোকানো হচ্ছে, Schedule Tribes বলে সংরক্ষণ দেওয়া হবে আসামে। সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ, মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনওয়ালও এখন থেকে এস টি হয়ে যাবে, সংরক্ষণ পাবেন। ৬ টা গোষ্ঠীকে ST বানানোর বিলও চলে এসেছে সংসদে।

এই আসাম চুক্তি অনুযায়ী ১৯৭১ র ২৪ শে মার্চের পর যারা এসেছেন বাংলাদেশ থেকে তারা আসামে থাকতে পারবেন না। নাগরিকত্ব বিলের মাধ্যমে শরণার্থী হিসাবে আশ্রয় পেলেও আসামে থাকতে পারবেন না। ভারতের অন্য রাজ্যে চলে যেতে হবে। অর্থাৎ আসামের এন আর সি ছুট বাঙালি উদ্বাস্তু হবেই। গতকাল আসামের গুয়াহাটির সাংসদ বিজয়া চক্রবর্তী লোকসভায় বলেছেন আসাম চুক্তির ছয় নম্বর ধারার কারণে নাগরিকত্ব বিলের মাধ্যমে শরণার্থী হিসাবে আশ্রয় পাওয়া হিন্দু বাঙালিকে আসাম থেকে অন্যত্র সরানো হবে।

তাহলে নাগরিকত্ব বিল কি সুরক্ষা দিল? কাঁচকলা! আসলে ভাঁওতাবাজি। বুঝলেন? আমার কথা বিশ্বাস হচ্ছে না? যা যা লিখেছি ভেরিফাই করে নিন। তারপর ভুল হলে, এসে আমার গালে থাপ্পড় কষান। এই বিল এসেছে হিন্দু বাঙালিকে বোকা বানানোর জন্য। এই বিল এসেছে বাংলা তথা সারা ভারতে হিন্দু-মুসলিম খেলা খেলার জন্য। এই বিল এসেছে বোকা বানিয়ে আসামে বাঙালিকে দাস বানানোর জন্য। বলতে ভুলে গেছিলাম, জানিয়ে দিই। এই বিল সাংবিধানিক ভাবে অবৈধ। ভারতে ধর্মের নামে নাগরিকত্ব হয় না। রাজ্যসভায় পাশ হয়ে গেলেও সুপ্রীম কোর্ট খারিজ করে দেবে। তবে সেটা হয়ত ভোটের পর হবে, তার আগে বিজেপি আপনার মাথায় বেল ভেঙে হিন্দু-মুসলমান রাজনীতি করে নেবে।

যদি এখনও সুস্থ থাকেন, তবে বলছি। এন আর সি, নাগরিকত্ব বিল এসবের আগে আসামে বাঙালির কি কি অধিকার ছিল, এখন কি থাকছে সহজ যোগ-বিয়োগের খেলা টা খেলে নিন। সব জলের মতো স্পষ্ট হয়ে যাবে। বিজেপি কিভাবে আসামের হিন্দু বাঙালি তথা আপামর বাঙালির সর্বনাশ করল বুঝলেন? তাই নাগরিকত্ব বিল নিয়ে লাফানোর কিছু নেই। সব মিথ্যে ভাঁওতাবাজি।

(লেখাঃ কৌশিক মাইতি)

ছবি